অ্যারন বুশনেল যখন লাইভস্ট্রিমে যাওয়ার জন্য তাঁর মোবাইল ফোনটি মাটিতে রেখেছিলেন এবং ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের সামনে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে মৃত্যুবরণ করলেন, তখন তিনি আসলে চরমপন্থি শয়তানের বিরুদ্ধে ঐশ্বরিক এক সহিংসতার নজির স্থাপন করেছেন। তিনি গাজায় চলমান গণহত্যা পরিচালনাকারীদের অন্যতম মার্কিন বিমানবাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এ বাহিনী নৈতিক দিক থেকে নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নিধনযজ্ঞে যারা (জার্মান সৈনিক, প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, আমলা) সহযোগিতা করেছিলেন, তাদের চেয়ে কম দোষী নয়।
দূতাবাসের গেটের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় ভিডিও বার্তায় তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্তও গণহত্যায় জড়িত থাকব না। আমি প্রতিরোধের চরম একটি পথ বেছে নিতে যাচ্ছি। কিন্তু ঔপনিবেশিক দখলদারের হাতে ফিলিস্তিনের অধিবাসীরা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন, তার তুলনায় এই প্রতিবাদ মোটেও চরম কিছু নয়। আমাদের শাসকগোষ্ঠী এ পরিস্থিতিকেই স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করেছে।’
তরুণরা অসংখ্য কারণে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হন। কিন্তু কাউকে অনাহারে রাখা, বোমা মারা এবং নারী ও শিশুদের হত্যার উদ্দেশ্যে কেউই এ কাজে যোগ দেন না। একটি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বে খাদ্য, আশ্রয় ও ওষুধ পৌঁছে দিতে মার্কিন নৌবহরের গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ ভেঙে দেওয়া এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্য তুলে নিতে দেশটিকে চূড়ান্তভাবে জানিয়ে উচিত নয় কি? বোমাবর্ষণ থামিয়ে দিতে মার্কিন যুদ্ধবিমানের গাজায় নো ফ্লাই জোন জারি করা উচিত নয় কি? ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহসহ বিলিয়ন অর্থের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করা উচিত নয় কি? গণহত্যায় জড়িত ও তার সমর্থকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা উচিত নয় কি?
বুশনেলের মৃত্যু আমাদের এসব প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আত্মাহুতি দেওয়ার আগমূহূর্তে তিনি এ কথাই পোস্ট করেছিলেন, “দাস যুগে বেঁচে থাকলে আমি কী করতাম? অথবা ‘জিম ক্রো সাউথ’ কিংবা বর্ণবৈষম্যকালে আমার ভূমিকাই বা কী হতো? অথবা আমার দেশ গণহত্যা চালালে আমার কী করা উচিত? উত্তর হলো: আপনি এই মুহূর্তে এটাই করছেন।”
১৯৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী কুর্দিদের রক্ষা করতে ইরাকের উত্তরাংশে হস্তক্ষেপ করেছিল। কুর্দিরা নিদারুণ ভোগান্তিতে ছিল, কিন্তু গাজার গণহত্যার তুলনায় তা নিতান্তই কম। সে সময় ইরাকি বিমানবাহিনীর ওপর নো ফ্লাই জোন আরোপ করা হয়। গণহত্যা তখনই নারকীয়, যখন তা আমাদের শত্রুদের দ্বারা সংঘটিত হয়। আর মিত্রদের বেলায় আমরা তাদের পক্ষ নিই এবং তা টিকিয়েও রাখা হয়।
জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেনজামিনের বন্ধু ফ্রিটজে হেইনলে ও রিকা সেলিগসন ১৯১৪ সালে জার্মান সমরবাদ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিবাদে আত্মহত্যা করেছিলেন। বেনজামিন তাঁর ‘ক্রিটিক অব ভায়োলেন্স বা সহিংসতার পর্যালোচনা’ প্রবন্ধে র্যাডিকেল বা চরমপন্থি শয়তানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিবাদ নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন। চরমপন্থি শয়তানের যে কোনো বিরুদ্ধাচরণকে তা ন্যায়বিচারের নামে আইন ভঙ্গ বলে ঘোষণা দেয়। তবে এ প্রতিবাদ ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে নিশ্চিত করে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক সহিংসতার নিন্দা জানানো হয়। পদক্ষেপটি প্রতিবাদকারীকে মৃত্যুমুখে ধাবিত করে। বেনজামিন প্রতিরোধের এই চরম অবস্থাকে ‘ঐশ্বরিক সহিংসতা’ বলেছেন। বেনজামিন লিখেছেন, ‘কেবল আশাহতদের আশা দিতেই আমরা এর আশ্রয় নিই।’
সামাজিক যোগাযোগামাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার শিকার বুশনেলের আত্মাহুতি এমনই একটি প্রতিবাদ। এর মানে হলো, ঘটনাটি এখনও জানা যায়নি। বুশনেল নিজের জীবনপ্রদীপ এমনভাবে নিভিয়ে দিয়েছেন, যেভাবে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জীবন নিভে যাচ্ছে; যেখানে শিশুরাও বাদ যায়নি। আমরা তাঁকে আগুনে জ্বলে মরতে দেখেছি। ঠিক একই ঘটনা আমাদের কারণে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গেও ঘটছে।
বুশনেলের আত্মাহুতি ১৯৬৩ সালে ভিয়েতনামের বৌদ্ধভিক্ষু থিক কুয়াং ডুক কিংবা ২০১০ সালে তিউনিসিয়ার তরুণ ফল বিক্রেতার ঘটনার মতোই। এতে রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে এবং দর্শকদের ঝিমুনি কেটে দেয়। এ ঘটনা দর্শকদের মনগড়া ধারণাকে প্রশ্ন করতে এবং সক্রিয় হতে বাধ্য করে।
যেদিন করপোরেট ও বর্ণবাদী ইসরায়েলি রাষ্ট্র ধ্বংস হবে, সেদিন যে রাস্তায় বুশনেল নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন, সেখানে তাঁর নাম লেখা হবে। জান পালাছের মতো তিনিও নৈতিক সাহসের জন্য সম্মানিত হবেন। অধিকাংশ বিশ্ববাসীর প্রতারণার শিকার ফিলিস্তিনিরা বুশনেলকে বীর হিসেবে দেখছেন। তাঁর কারণেই আমাদের দানবে পরিণত করা যাবে না।
ঐশ্বরিক সহিংসতা দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রতারক শাসক শ্রেণিকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। এটি তাদের নৈতিক স্খলনকে উদোম করে দেয় এবং এ বার্তা দেয়– সবাই ভয়ে স্থবির হয়ে পড়েনি। এর মধ্যে চরমপন্থি শয়তানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান শোনা যায়। বুশনেল এটাই চেয়েছিলেন। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের কল্যাণেরই কথা বলে।
ক্রিস হেজেস: পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন সাংবাদিক; দ্য ক্রিস হেজেস রিপোর্ট থেকে অনুবাদ করেছেন ইফতেখারুল ইসলাম

নিউজ ডেস্ক,অনলাইন