লাশের গন্ধ নাকে নিয়েও আশাবাদী হতে হবে

  • আপলোড সময় : ৬ মার্চ ২০২৪, বিকাল ৬:১৭ সময়
  • আপডেট সময় : ৬ মার্চ ২০২৪, বিকাল ৬:১৭ সময়
লাশের গন্ধ নাকে নিয়েও আশাবাদী হতে হবে

এ কেমন সমাজ? রাজপথে নিরাপত্তা নেই। ঈদের কাপড় কিনতে গেলে দগ্ধ হতে হয়। সপ্তাহ শেষে সপরিবারে পানাহারের জন্য রেস্তোরাঁতে খাবার খেতে গেলে কখনও কখনও আগুনের কালো ধোঁয়া শ্বাস চেপে ধরে। মেধাবী তরুণ-তরুণীর সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটে; আর মধ্যবিত্ত সপরিবারে প্রাণ হারায়। দেশের রাজধানীতে পোশাকি উন্নয়নের শেষ নেই। চকচকে দালান, বাহারি রেস্তোরাঁ, সুসজ্জিত মনিহারি দোকান আর ঝকঝকে মেট্রোরেলের আধুনিকতা উন্নয়নের নামে প্রতারণা করে শুধু! 

দুর্ঘটনা ঘটে গেলে টিভি চ্যানেলগুলো স্বজনের আহাজারিকে তুলে ধরে দিনরাত। আমরা দর্শক হয়ে কখনও হাহাকারে সুর মেলাই; কখনও ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বর উঁচু করি। এ পর্যন্তই। দায়িত্ব কেউই নিতে চাই না। সরকার দোষ দেয় ভবন মালিককে; ভবন মালিক দেন স্থপতিকে; স্থপতি দেন ব্যবসায়ীকে। সুশীল সমাজ হতাশাগ্রস্ত হয়ে হাল ছাড়ে; নৈরাশ্যের বাণী শোনায়। আর প্রকৌশলী-স্থপতিরা ভবন পরিত্যাগের প্রেসক্রিপশন দেন। এটিই কি তবে সাধারণ মধ্যবিত্তের ললাট লিখন?

বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এ ঘটনা অঘটনঅঘটনকুশল বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতার একটি প্রক্ষেপণ মাত্র। তবে এমন দুর্ঘটনা রোধ করা অসম্ভব– এটি মানতে রাজি নই। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা বেড়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পোশাকশিল্পে যখন আঘাত এসেছে, তখন টনক নড়েছে আমাদের। তাই আসুন, ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, একবার ভেবে দেখি।

ভবনে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে আলোচনায় যে দিকগুলো বারবার উল্লিখিত হয়, তার মধ্যে ভবন নির্মাণে অনিয়ম, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, দুর্ঘটনার সময় ভবন পরিত্যাগের জন্য পর্যাপ্ত এস্কেপ ও অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের ভবনে প্রবেশযোগ্যতা না থাকা, ইলেকট্রিক তার কিংবা গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ভবন নির্মাণে অনুমোদন প্রদানে দুর্নীতি, ভবন মালিকের অবহেলা, ব্যবসায়ীদের অসাবধানতা– এসব দিকও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। এসব বিষয়ে পর্যালোচনায় বেশির ভাগ সময়ে কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় না। কেননা, একদিকে নির্মিত ভবনে নিরাপত্তা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়; অন্যদিকে আগামীতে নির্মিতব্য ভবনের অনুমোদন কিংবা ভবনে মালিক বা ব্যবসায়ীর দায়িত্বহীনতা অতিক্রম করার প্রত্যাশা অমূলক বলে মনে হয়। আদতে এই হতাশা থেকে কি কোনো পরিত্রাণ নেই?

ভবিষ্যৎ অগ্নিকাণ্ডের প্রতিকারে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে মহানগরীর অধিকাংশ ভবনই বহুতলবিশিষ্ট এবং এগুলোর ব্যবহার বহুমুখী। এই মাল্টিপারপাস ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে গেলে এর নকশা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। যেমন– ভবনে উন্মুক্ত গ্যাস সিলিন্ডার রাখা চলবে না; ইলেকট্রিক তারের যথাযথ ইন্সুলেশন থাকতে হবে; সিঁড়ি প্রশস্ত হতে হবে; দুর্ঘটনার জানান দিতে ফায়ার অ্যালার্ম থাকতে হবে। বিদ্যমান ভবনে এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্মাণের কয়েক বছর পরও বহাল রয়েছে কিনা– নিশ্চিত করার উপায় কী? রানা প্লাজা-পরবর্তী পদক্ষেপ পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। 

২০১৩ সালের পর গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি’ ও ‘অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। বাংলাদেশের ১৫১টি ব্র্যান্ড বা কোম্পানি এর স্বাক্ষরকারী। এই অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্স প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদেশিক ব্র্যান্ডের অর্থায়নে নিয়মিত গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়েছে এবং গার্মেন্টস কারখানার ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। বাণিজ্যিক ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সের মতো মনিটরিং বডি তৈরি করা যেতে পারে। সরকারি মনিটরিংয়ের ওপর ভরসা রাখলে চলবে না। 

অন্যদিকে ভবন কর্তৃপক্ষ যেন আগুনের ঝুঁকি কমাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, সে বিষয়ে কী কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে? ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি সন্দর্ভে ভিয়েতনামের হ্যানয় শহরের বহুতল ভবনের ব্যবস্থাপনায় ‘কন্ট্রোল অল্টারনেটিভ’ কৌশল অবলম্বনের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাইরেও বাজারভিত্তিক (মার্কেট কন্ট্রোল) ও গোষ্ঠীভিত্তিক (ক্ল্যান কন্ট্রোল) প্রণোদনাকে কাজে লাগানো যায়। মার্কেট কন্ট্রোল পন্থা যে কাজ করে– তা রানা প্লাজা-পরবর্তী পদক্ষেপগুলোই প্রমাণ দিয়েছে। তবে হ্যানয় শহরে ভবনে অগ্নিকাণ্ড হ্রাসে ক্ল্যান কন্ট্রোল কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। প্রশাসনিক নিয়মের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধ ভিয়েতনামে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। যদি সাধারণ মানুষ ভবনে আগুনের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত হয় এবং দুর্ঘটনার সময় ভবন ত্যাগের কৌশল ফায়ার ড্রিলের মাধ্যমে আয়ত্তে আনতে পারে, তবে এই ক্ল্যান কন্ট্রোল বাংলাদেশেও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।  

ভবনে অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এ থেকে পরিত্রাণ অসম্ভব। কারণ দুর্নীতি, ভবন বা দোকান মালিকদের লোভ, জনগণের অসাবধানতা– এমন দোষারোপ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্র ও জনগণকে মানতে হবে– এই অযাচিত দহন থেকে মুক্তি সম্ভব, যদি আমাদের সদিচ্ছা কাজ করে। বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ ভিক্টর ফ্রাঙ্কেলকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অন্য বন্দিদের সঙ্গে এক কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে নেওয়া হচ্ছিল। আউশউইৎজ ক্যাম্পের কাছাকাছি এসে তিনি বাতাসে লাশের গন্ধ পেয়েছিলেন। কারণ নাৎসিরা সেখানে শিশুদের পর্যন্ত পুড়িয়ে মেরেছে। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেল এই অসহায়ত্বের ভেতরেও জীবনের মানে খুঁজেছেন। যুদ্ধ শেষে তৈরি করেছেন মনস্তত্ত্বের বিখ্যাত শাখা ‘লোগোথেরাপি’। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের যখন নিজের নামটি পর্যন্ত পরিত্যাগ করতে হয়েছিল, তখনও সেখানে আশা ছিল। সেই ক্যাম্পেও প্রেম ছিল; বেজেছিল ভায়োলিনের সুর, পিতা আশায় বুক বেঁধেছিলেন সন্তানকে আরেকবার আলিঙ্গন করার জন্য। বেইলি রোডের বাতাসে লাশের গন্ধ রয়েছে ঠিক, তবে সেই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েই আমাদের আশাবাদী হতে হবে। 

নাভিদ সালেহ: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে পুরকৌশল, স্থাপত্য ও পরিবেশ কৌশল অনুষদের অধ্যাপক





কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক

সর্বশেষ সংবাদ