ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্রের অপেক্ষায়...

  • আপলোড সময় : ৬ মার্চ ২০২৪, বিকাল ৬:১৩ সময়
  • আপডেট সময় : ৬ মার্চ ২০২৪, বিকাল ৬:১৩ সময়
ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্রের অপেক্ষায়...

নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে অপহরণ করা হয়েছিল। ওই রাতেই তাঁর বাবা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি করেন এবং র‌্যাব ১১-এর কার্যালয়ে চিঠি দেন। দু’দিন পর ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর খালপাড় থেকে পুলিশ ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে। ৮ মার্চ রাতেই রফিউর রাব্বি বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দণ্ডবিধি ৩০২/৩৪ ধারায় আসামি অজ্ঞাত উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করেন। ১৮ মার্চ জেলা পুলিশ সুপারের কাছে ত্বকী হত্যার জন্য তিনি আটজনের নাম উল্লেখ করে একটি অবগতিপত্র দেন। তদন্তে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১৩ সালের ২৮ মে উচ্চ আদালতের নির্দেশে র‌্যাব মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।

সে বছর ২৯ জুলাই ইউসুফ হোসেন লিটন নামে এক ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ত্বকীকে কখন, কীভাবে, কোথায়, কারা কারা এবং কেন হত্যা করেছে, তার বিশদ বর্ণনা দেয়। এই জবানবন্দির কিছুদিন পর ৭ আগস্ট র‌্যাব সে সময়ের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের ‘উইনার ফ্যাশন’খ্যাত টর্চার সেলে অভিযান পরিচালনা করে। সেখানে তারা দেয়াল ও আসবাবে গুলির চিহ্ন দেখতে পায় এবং সেখান থেকে রক্তমাখা প্যান্ট, দড়ি, রক্তমাখা গজারির লাঠি, মাদক সেবনের সরঞ্জাম, পিস্তলের অংশসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। সে বছর ১২ নভেম্বর সুলতান শওকত ভ্রমর নামে অপর এক ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। 

ত্বকী হত্যার এক বছরের মাথায় ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র‌্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান র‌্যাবের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ত্বকী হত্যারহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন মিলে কিশোরকে হত্যা করেছে। হত্যার কারণ হিসেবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, গণপরিবহনে শামীম ওসমানের অনুগতদের ব্যাপক চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন করেছিলেন। তৃতীয়ত, চিহ্নিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভূমি দখলের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অচিরেই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।

কিন্তু পরে অদৃশ্য ইশারায় ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ওই হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সাত খুনের মামলার কার্যক্রম নিম্ন ও উচ্চ আদালতে সম্পন্ন হয়েছে। শিশু রাজন-রাকিব হত্যাসহ কিছু মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্রটি ১১ বছরেও আদালতে পেশ করা হয়নি। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া সুলতান শওকত ভ্রমর, ইউসুফ হোসেন লিটনসহ সবাই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে বা দেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে শামীম ওসমান ত্বকী হত্যার বিচারপ্রার্থীদের হামলা, মামলাসহ নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।  

ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে বিশ্বের ২১টি দেশে প্রতিবাদ হয়েছে। এ বিচারের দাবিতে টানা ১১ বছর ধারাবাহিকভাবে সমাবেশ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, আলোক প্রজ্বালন, গোলটেবিল বৈঠক, প্রতীকী অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দেশের লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা লেখালেখি, কবিতা, ছবি আঁকা, গান রচনা, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, স্মারকগ্রন্থ, গান ও আবৃত্তির সিডি প্রকাশসহ বিভিন্নভাবে এ হত্যার বিচার চেয়ে আসছেন। ২০১৩ সালের ৮ মার্চ ত্বকীর লাশ পাওয়ার তারিখকে কেন্দ্র করে আট বছর ধরে প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে এভাবে টানা আন্দোলনের কতটা নজির রয়েছে, আমাদের জানা নেই। 

ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র দ্রুত আদালতে জমা দিয়ে সব ঘাতক ও নির্দেশদাতাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের বিচার পাওয়ার অধিকার সংবিধান নিশ্চিত করেছে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে ৬০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করার জন্য সংবিধানে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ১১ বছরেও ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। অথচ ২০১৪ সালে র‌্যাবের পক্ষে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত থাকার কথা বলা হয়েছিল। 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়– বিচার প্রক্রিয়া হয়তো বিলম্বিত করা যায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপরাধীকে অবশ্যই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। আজ নয় তো কাল।        

হালিম আজাদ: কবি ও সাংবাদিক; সদস্য সচিব, 

সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ 





কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক

সর্বশেষ সংবাদ