সিকি শতাব্দী পরও প্রাইজবন্ডের মূল্যমান বাড়ল না

  • আপলোড সময় : ৬ মার্চ ২০২৪, বিকাল ৬:১২ সময়
  • আপডেট সময় : ৬ মার্চ ২০২৪, বিকাল ৬:১২ সময়
সিকি শতাব্দী পরও প্রাইজবন্ডের মূল্যমান বাড়ল না

মুফতে ধনী হওয়ার শখ কার না আছে! তাই মানুষ কেনে লটারির টিকিট কিংবা প্রাইজবন্ড। লটারির টিকিট আর প্রাইজবন্ড হারাম না হালাল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেককে দেখি প্রাইজবন্ড কেনেন ও রাখেন ঠিকই, তবে লটারিতে বিনিয়োগ করেন না। যুক্তি দেন– লটারির টিকিট যেহেতু ড্রর পর বাতিল, তাই সেটা জুয়া। কিন্তু প্রাইজবন্ডের মূল্য যেহেতু সবসময় একই থাকে, তাই সেটা জায়েজ। যে যেটা বুঝতে চায় বুঝুক, আমি কোনো বিতর্কের মধ্যে নেই। তবে মুফতে বড়লোক হওয়ার শখ আমারও কম নেই। তাই প্রাইজবন্ড কিনি আর সংরক্ষণ করি যত্ন করে।

প্রাইজবন্ডের বয়স আমার বয়সের কাছাকাছি– আমার চেয়ে বছরখানেকের ছোট। সরকারের তহবিল বাড়াতে ১৯৫৬ সালে আয়ারল্যান্ডে প্রথম আইন হয় প্রাইজবন্ড চালুর। বিক্রি শুরু হয় ১৯৫৭-এর মার্চ মাসে। তারপর ক্রমান্বয়ে প্রাইজবন্ড চালু হয় দুনিয়ার প্রায় সব দেশে। গুগলে তথ্য পেলাম না, পাকিস্তানে কবে প্রাইজবন্ড চালু হয়েছিল। তবে মনে আছে, ১৯৬৩ সালে আব্বা আমাদের মেজ বোনের নামে কেনা ১০ টাকার প্রাইজবন্ডে ১ হাজার টাকা পুরস্কার জিতেছিলেন। তখন সেটা অনেক বড় অঙ্ক ছিল। কিছু পরে ৫ টাকার বন্ডও চালু হয়। গোটা পাকিস্তান আমলে ১০ টাকা আর ৫ টাকার প্রাইজবন্ড চালু ছিল।

স্বাধীনতার পর ৫ টাকার বন্ড বাজার থেকে তুলে নেওয়া হলো, আর ১০ টাকার সঙ্গে সমান্তরাল বাজারে এলো ৫০ টাকার বন্ড। ১৯৯৫ সালে এই দুই রকমের বন্ডই বাতিল করে বাজারে আসে ১০০ টাকার প্রাইজবন্ড। একজন সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড কিনতে পারেন। আমাদের প্রচলিত প্রাইজবন্ডে ৬ লাখ টাকার প্রথম পুরস্কারের পর ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার দ্বিতীয় পুরস্কার, ১ লাখ টাকার তৃতীয় পুরস্কার ছাড়াও ৫০ ও ১০ হাজার করে চতুর্থ এবং পঞ্চম পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। পুরস্কারের টাকা থেকে সরকার কর হিসেবে কেটে নেয় ২০ শতাংশ।

২৯ বছর ধরে বাংলাদেশে প্রাইজবন্ডের মূল্যমান সেই ১০০ টাকাই বহাল। অথচ চালু হওয়ার পর বছর ৩৫-এর মধ্যেই প্রাইজবন্ডের মূল্যমানে তিনবার পরিবর্তন এসেছে। পাকিস্তানে প্রচলিত ১০০, ২০০, ৭৫০, ১ হাজার ৫০০, ৭ হাজার ৫০০, ১৫ হাজার ও ২৫ হাজার রুপির প্রাইজবন্ড। ৪০ হাজার রুপি মূল্যমানের প্রাইজবন্ড ২০২০ সালের ২৪ জুন বাতিল করা হয়েছে। সব মূল্যমানের বন্ডে প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয়– এই তিন রকম পুরস্কার চালু আছে। বিলুপ্ত হওয়া ৪০ হাজার রুপির বন্ডে প্রথম পুরস্কার ছিল সাড়ে ৭ কোটি রুপি আর তৃতীয় পুরস্কার ৫ লাখ রুপি। এখন যেটা সর্বোচ্চ মানের, সেই ২৫ হাজার রুপির প্রাইজবন্ডে প্রথম পুরস্কার ৫ কোটি রুপি। আয়কর ফাইল থাকলে ১৫ শতাংশ; না থাকলে ২০ শতাংশ কর দিয়ে বাকি টাকা পেলেও একজন প্রথম পুরস্কারপ্রাপ্ত বেশ ধনী হয়ে যেতে পারেন ‘যদি লাইগ্যা যায়’। ভারতেও চালু আছে ৬ প্রকারের বন্ড। ২০০, ৭৫০, ১ হাজার ৫০০, ৭ হাজার ৫০০, ১৫ হাজার ও ৪০ হাজার টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড। সেখানেও পুরস্কার তিনটিই– প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়।

১৯৯৫ সালে ১০০ টাকার ক্রয়মূল্য যত ছিল, এখন তার ক্রয়মূল্য অনেক কম। বছরখানেক আগে ব্যাংকে পেনশনের টাকা তোলার সময় চেয়েছিলাম অন্তত একটা ১০০ টাকার নোটের বান্ডিল। অবাক করে দিয়ে অফিসার বললেন, ছোট নোট রাখা হয় না। আ হারে! একসময় কত দামি এবং সর্বোচ্চ ব্যাংক নোট একশ টাকার নোটকে কী অবলীলায় ব্যাংক কর্তা ঠেলে ফেলে দিলেন ছোট নোটের পর্যায়ে। সেখানে ১০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ডই আমাদের একমাত্র প্রচলিত প্রাইজবন্ড। 

ভারত বা পাকিস্তানের মতো ৬ থেকে ৮ রকম না হোক; না হোক ৪০ হাজার টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড, তবে কিছুটা বাড়ুক। ১০০ টাকার প্রাইজবন্ডের পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড চালু হোক। পুরস্কার ১০০ টাকার বন্ডের মতো পাঁচ ধাপের নয়, তিন ধাপেরই হোক। প্রথম পুরস্কার সোয়া কোটির হলে সরকারি খাতে সঞ্চয় অনেক স্ফীত হবে। পুরস্কারপ্রাপ্তরাও যার কপালে থাকবে; কর কাটাকুটির পরও কোটিপতি হয়ে যাবেন। ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্রের জন্য যে সংখ্যক ভিড় দেখা যায়, তাতে ৫ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড কেনার মানুষও দেশে এখন প্রচুর সংখ্যায় থাকবে বলে আশা করা যায়। ভারত ও পাকিস্তানে অবশ্য পাঁচ হাজার মূল্যমানের প্রাইজবন্ড নেই, কিন্তু সাড়ে ৭ হাজার রুপি মূল্যমানের প্রাইজবন্ড আছে; পাকিস্তানে যার প্রথম পুরস্কার দেড় কোটি রুপি, দ্বিতীয় পুরস্কার ৩টি ৫০ লাখ রুপি, আর তৃতীয় পুরস্কার ৯৩ হাজার রুপি করে ১ হাজার ৬৯৬টি। 

মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ২০০ টাকা মূল্যমানের নতুন নোট চালু হয়েছে। যদি প্রাইজবন্ডও বড় মানের চালু হয় তাহলে আমাদের মতো কপালনির্ভরদের বিনা আয়াসে ধনী হওয়ার একটু সাধ মিটতে পারে। ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ কেউ ধনী হওয়ার পাশাপাশি বাড়বে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় খাতের সঞ্চয়, যাতে লাভ ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের। 

আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব





কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক

সর্বশেষ সংবাদ