সোমবার, ৪ মার্চ দিনভর গুলশান, ধানমন্ডি, বসুন্ধরা, ওয়ারীর বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে নিয়মের ব্যত্যয় খুঁজতে পুলিশ, রাজউক, সিটি করপোরেশন ও ফায়ার ব্রিগেড অভিযান পরিচালনা করে। সাতমসজিদ রোডের একটি বিল্ডিংয়ে ১২টি রেস্টুরেন্ট সিলগালা করা হয়। একই রোডের ১৫ তলা একটি ভবন পুরোটাই সিলগালা করে দেন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট। দিন শেষে অভিযান থেকে ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হয়। এর মধ্যে দু’জনের জামিন হয়েছে, ১৯ জন কারাগারে। জরিমানা করা হয় বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্টকে।
অভিযোগ, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিলেও রেস্টুরেন্টের অনুমোদন নেই। এ ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস সিলিন্ডিার ব্যবহার করা হচ্ছে। বিল্ডিংয়ে ফায়ার এক্সিট নেই অথবা ফায়ার এক্সিট ব্লকেজ করে রাখা হয়েছে। এবং ফায়ার সেফটি ব্যবস্থাপনায় অবহেলা রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনায় নির্মমভাবে ৪৬ জন নিহত হন। স্বজন হারানোর আর্তনাদের পাশাপাশি অভিযোগ ওঠে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করার দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলা ও দুর্নীতি নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় রাজউক গতানুগতিকভাবে জানায়, অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিল্ডিংটিতে যদিও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান করার অনুমতি ছিল, কিন্তু রেস্টুরেন্ট করার অনুমতি ছিল না।
বেইলি রোডের মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় হাইকোর্টে রিট করা হয় যেন আবাসিক ভবনে রেস্টুরেন্ট করতে দেওয়া না হয়। নিয়মনীতির কোনো রকম পরোয়া না করে যত্রতত্র রুফটপ রেস্টুরেন্ট করায় হাইকোর্টও বিস্ময় প্রকাশ করেন। অর্থাৎ বিচার বিভাগ, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বস্তরের ক্ষোভ মিলিয়ে রেস্টুরেন্টগুলো এখন তোপের মুখে। সেই ক্ষোভ প্রকাশে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে একটা বিল্ডিংয়ের অবৈধ রুফটপ রেস্টুরেন্ট ভাঙতেও দেখা যায় বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে। এই অভিযান এখন অত্যন্ত যৌক্তিক মনে হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ প্রশংসাও হচ্ছে।
মৃদুস্বরে হলেও কিছু লোক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ অভিযানের সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেছেন। এ মুহূর্তে প্রচণ্ড তোপের মুখে থাকা রেস্টুরেন্ট মালিক, আটক হওয়া কর্মচারীদের কথা কে শুনবে? মোবাইল কোর্ট খুঁজে দেখেছেন নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে কিনা; যেখানে পেয়েছেন, যেখানে সম্ভব হয়েছে, আইনের ভেতরে থেকেই এসব আটক ও জরিমানা করেছেন।
তবে নিয়মের ব্যত্যয় রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ হলেও সবসময় অন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা চলে না। মানবিক বিবেচনা এবং রাষ্ট্রীয় আইন প্রজ্ঞার সঙ্গে ব্যবহার করবেন বলেই একজন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তিনি একজন মানুষ। ফিল্ডে তিনিই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রকে চলমান হুজুগে বিভ্রান্ত হওয়া চলে না। তাই আরেকটু বোধসম্পন্ন ও বিচক্ষণ হওয়া জরুরি মনে করি। শুধু নিয়মের ব্যত্যয় দেখাই জরুরি হতো, তবে এসব কাজের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার মানুষের চেয়ে বেশি ইফেক্টিভ।
যে বিল্ডিংটির ১২টি রেস্টুরেন্ট সিলগালা করা হয়েছে, তার পাশের এক বিল্ডিংয়ের ১৪ তলায় আমি বেশ কিছুদিন রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করেছি। আমরা যখন শুরু করি, সাতমসজিদ রোডে তখন চার-পাঁচটি রেস্টুরেন্ট ছিল। ১৪ তলা বিল্ডিংয়ে রেস্টুরেন্ট ছিল তিনটি। আমাদের দ্রুত সাফল্য দেখে শেষ পর্যন্ত এই বিল্ডিংয়ে রেস্টুরেন্ট হয়েছিল ১৭টি। বিল্ডিংয়ের রেস্টুরেন্ট মালিকরা ফ্লোর মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি অনেকবার, তারা যেন আর রেস্টুরেন্ট ভাড়া না দেন। কারণ এত লোকের ধারণক্ষমতা নেই বিল্ডিংয়ের। ছোট দুটি লিফট, লাইনে দাঁড়িয়ে ১৪ তলায় উঠতে আধঘণ্টার বেশি সময় লাগত। কিন্তু বিল্ডিংয়ের মালিকরা ফ্লোরগুলো রেস্টুরেন্ট করতে ইচ্ছুকদের সর্বোচ্চ ভাড়ায় দিতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন।
বাস্তবতা হচ্ছে, ফ্লোরের জন্য রেস্টুরেন্ট থেকে যতটা বেশি ভাড়া দেওয়া সম্ভব হতো, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা অন্যায্য। আর উচ্চমূল্যে রেস্টুরেন্টের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে, প্রতি মাসে সে টাকা মানুষের পকেট থেকে বের করে আনতে রেস্টুরেন্ট মালিক ও ম্যানেজারদের জন্য ফ্লোরের এক স্কয়ার ফিট জায়গাও ছেড়ে দেওয়ার বাস্তবতা থাকে না। ভোক্তাদের জন্য টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে স্টোরের জায়গা থাকে না, তখন ফায়ার এক্সিটের জায়গা ব্যবহার শুরু হয়। বারংবার ফায়ার এক্সিট ব্যবহার না করার অনুরোধ অগ্রাহ্য হয়। তেমন একটা পরিস্থিতিতে আমরা রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জন্য ওই কমার্শিয়াল বিল্ডিং ছেড়ে দিতে বাধ্য হই।
রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার সময় আমাদের ধারণা ছিল না কত ধরনের সার্টিফিকেট লাগে। আমরা ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট, টিন ইত্যাদি নিয়ে শুরু করি। ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়ে জেনেছি ফায়ার লাইসেন্স লাগবে। যোগাযোগ করে জানা গেল ফায়ার লাইসেন্স একক রেস্টুরেন্টকে দেওয়া হয় না; দেওয়া হয় বিল্ডিংকে। বিল্ডিংয়ের ফায়ার লাইসেন্স ছিল। এরপর নানা কারণে ও ঘটনায় জানলাম প্রিমিসিস লাইসেন্স, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সব কর্মচারীর সার্টিফিকেট, নিরাপদ খাদ্য, ডিসি অফিসের লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, কারখানা লাইসেন্স, শ্রম অধিকারসহ ১৩-১৭টি লাইসেন্স লাগে। এ লাইসেন্সগুলো পাওয়ার প্রক্রিয়াও জটিল। আমার অভিজ্ঞতায় সর্বশেষ পরিবেশ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিলাম। আবেদন পর্যন্তই। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, আমরাও ক্লান্ত ছিলাম।
এত এত সার্টিফিকেট নিয়ম রক্ষা তো বটেই; এবং কোনো একটা সার্টিফিকেট না থাকা নিয়মের ব্যত্যয় তো অবশ্যই, তবে একটা রেস্টুরেন্টের সব সার্টিফিকেট থাকা এবং সেই রেস্টুরেন্ট বছর শেষে লাভজনক হওয়া অবাস্তবও বটে। রেস্টুরেন্ট ব্যবসার এই জটিলতা এবং প্রয়োজনীয়তা ভোক্তা বা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা না বুঝলেও হাইকোর্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনুধাবন করা জরুরি।
যে ধরনের রেস্টুরেন্টের ওপর অভিযান চলছে, তা মূলত শহরের এক ধরনের বিনোদন কেন্দ্র। রেস্টুরেন্ট পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি শুধু খাবার বিক্রি করলেও ভোক্তারা মূলত সেখানে আসে প্রিয়জনদের সঙ্গে সুন্দর পরিবেশে একটু সুন্দর সময় কাটাতে। নিতান্তই উপযোগিতা না থাকলে এ ধরনের রেস্টুরেন্ট এত জাঁকজমক চেহারা নিয়ে সাজত না। এ শহরের নাগরিকদের বিনোদনের অভাব কিছুটা পূরণ করে এসব রেস্টুরেন্ট। প্রতিটি রেস্টুরেন্ট ভাঙার আগে এর পেছনের ইনভেস্টমেন্ট, বন্ধ করে দেওয়ার আগে কর্মচারীদের এর ওপর নির্ভরশীলতা, মোট কথা পেছনের বাস্তবতা অভিযান পরিচালনা করা কর্তৃপক্ষের জানা থাকা জরুরি।
এটা অনস্বীকার্য, রেস্টুরেন্টগুলো যোগ্য লোকের অভাবে অব্যবস্থাপনায় ভরপুর। এগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ভেতরে পরিচালিত হতে বাধ্য করতেই হবে। কিন্তু অভিযান পরিচালনার সময়ে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে মনে হচ্ছে, রেস্টুরেন্টগুলো যেন সন্ত্রাসীদের আড্ডা, তল্লাশি চলছে।
রেস্টুরেন্ট ব্যবসার ওপর প্রশাসনের এই অভিযান আইনের ভেতরে হলেও কিছু কিছু জায়গায় ন্যায়ের ব্যত্যয় ঘটছে কিনা; যাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, তাদের প্রতি ন্যায়ের ব্যত্যয় ঘটেছে কিনা– তা দ্বিতীয়বার পর্যবেক্ষণ করে দেখা উচিত। রেস্টুরেন্ট ব্যবসাকে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু এগুলো আসলে কতটা ব্যবসা করতে পারছে– এটা তদন্ত করে দেখা উচিত। আবাসিক ভবনে রেস্টুরেন্ট না করার জন্য হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে, ভালো প্রস্তাব। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে রেস্টুরেন্ট কোথায় কীভাবে হবে তার নীতিমালা প্রকাশ করা উচিত!
এত কথা বলার উদ্দেশ্য, চিন্তাহীন, পরিকল্পনাহীন প্রতিক্রিয়ামূলক এ অভিযান শুধু সংকটই বৃদ্ধি করছে, জনদুর্ভোগই বাড়াচ্ছে। পক্ষান্তরে এ অভিযান প্রশাসনের দুর্নীতিকেই বরং সহায়তা করছে। যাদের গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে, তারা হয়তো নিয়মের ব্যত্যয় করেছে, তবে তাদের জেলহাজতে আটকে রাখা ন্যায়সংগত মনে করি না। বরং বেইলি রোডের দুর্ঘটনা যাদের কারণে ঘটেছে, তাদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক হতে বাধ্য হতো। বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ড কিন্তু কোনো রেস্টুরেন্ট বা গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে হয়নি। তদন্তে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়। একজন শ্রীলঙ্কানসহ ২৬ জন নিহত হন সে দুর্ঘটনায়। সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪১ জন। তাজরীন ফ্যাশনস পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিক নিহত হন। এসব যাদের কারণে হয়েছে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে?
রেস্টুরেন্টগুলোকে মিডিয়া ট্রায়ালে বলির পাঁঠা বানানো অন্যায় মনে করি। একটি বিল্ডিংয়ে কত পরিমাণ লোক যাতায়াত করবে তার একটা আনুমানিক হিসাব তো থাকেই। সে হিসাব করেই নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত একটা বিল্ডিংয়ে কয়টা রেস্টুরেন্ট থাকতে পারে।
সচেতন সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রশাসনের লোক দেখানো সাময়িক প্রতিক্রিয়া থেকে বের হয়ে এসে স্থায়ীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক কার্যক্রম ঘোষণা করা জরুরি। অন্যথা একই রকম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হঠাৎ স্বজন হারানোর আশঙ্কা থেকেই যাবে।
নূরউল্লাহ মোহাম্মদ: সাবেক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী

নিউজ ডেস্ক,অনলাইন