নিজস্ব প্রতিবেদক |
“এই ভিটায় আমার জন্ম, এখানেই আমার সন্তানেরা মানুষ হয়েছে—আজ সেই ভিটায় আমি পরবাসী!”—কান্নায় ভেঙে পড়ে এভাবেই নিজের অসহায়তার কথা বলছিলেন সলঙ্গা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপক কুমার সরকার। কথাগুলো তার চোখের জল আর কণ্ঠের কাঁপুনিতে যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—একটা ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদ।
ঘটনাটি ঘটেছে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্ব দেলুয়া গ্রামে। অভিযোগ অনুযায়ী, পূর্ব বিরোধের জেরে ১০ এপ্রিল ২০২৫ রাতের আঁধারে ঘটে এ হামলার ঘটনা। স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তার অনুসারীরা শিক্ষক দীপক কুমার সরকারের পৈত্রিক জমিতে জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা, দোকানঘরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ এবং হামলার হুমকি দেয়।
ঘটনার পেছনের কাহিনি
দীপক কুমার সরকার জানান, তার পিতা চিত্ত রঞ্জন সরকার থেকে তিনি এবং তার আপন তিন ভাই ও কাকাতো ভাই মিলে ওই জমির মালিক হন। তারা যৌথভাবে জমিতে দোকানঘর নির্মাণ করে স্থানীয় জাকারিয়া হোসেন নামক ব্যক্তিকে ৪ বছরের মেয়াদে চুক্তিনামা করে ভাড়া দেন।
কিন্তু হঠাৎ করেই গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি মো. আবুল হাসেমের ছেলে রবিউল ইসলাম (৪৬), যিনি কিছুদিন আগে বিদেশ থেকে ফিরেছেন, জমিটি দখলের চেষ্টা শুরু করেন। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও জমি দখলের উদ্দেশ্যে দীপক সরকারের পরিবারকে নানাভাবে ভয়ভীতি, হুমকি ও প্রাণনাশের কথা বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জমি দখলের নাটকীয় রূপ
গত ১০ এপ্রিল রাতে দীপক সরকারের ভাড়াটিয়া জাকারিয়ার দোকানঘরে রবিউল ইসলাম ও তার সহযোগীরা তালা ভেঙে নিজের তালা লাগিয়ে দেয়। শুধু তালা ভাঙা নয়, তারা দোকানঘরের দরজা-জানালা ভাঙচুর করে, ভেতরের মালামাল ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এতে দোকানদার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, এবং দোকান ঘরটিও কার্যত জবরদখলে চলে যায়।
রবিউল ইসলাম ও তার সহযোগীরা দীপক কুমার সরকারের বসতবাড়িতেও হামলার হুমকি দেয়। ভুক্তভোগীর দাবি, তারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
ভুক্তভোগীর আর্তনাদ
দীপক কুমার সরকার বলেন—
“আমি একজন স্কুলশিক্ষক, সৎভাবে জীবন কাটাচ্ছি। জমিটা বাবার রেখে যাওয়া, এখানে ঘর তুলে বেঁচে আছি। আজ সেই জমিতে আমি ও আমার পরিবার অনিরাপদ। তারা শুধু আমার ঘর নয়, আমার বুকের ভেতরটা ভেঙে দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা থানায় অভিযোগ দিয়েছি, জিডি করেছি (নং ৩০৮, তারিখ ০৬/০৫/২৫)। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দিন কাটাচ্ছি চরম নিরাপত্তাহীনতায়।”
প্রশাসনের নিরবতা ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
ঘটনার বিষয়ে উল্লাপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বলেন—
“বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগ দেওয়ার পর অনেক দিন কেটে গেলেও থানার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে রবিউল ইসলাম ও তার দল এখনো এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, এবং দীপক সরকারের পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
একটি পরিবারের কান্না, সমাজের প্রতিচ্ছবি
পূর্ব দেলুয়া গ্রামের একজন প্রতিবেশী বলে—
“বাড়িঘর ভাঙলে মানুষ আবার গড়তে পারে, কিন্তু মন যখন ভেঙে যায়, তা আর জোড়া লাগে না। আজ দীপক দা’র পরিবার শুধু ভিটেমাটি নয়, শান্তির ঘরটাও হারিয়ে ফেলেছে।”
স্থানীয়রা আরও বলেন, এ ঘটনা শুধু দীপক সরকারের নয়—এটা একটি পরিবারকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার ভয়াবহ চেষ্টা। যদি প্রশাসন এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।
এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যেন দীপক কুমার সরকার এবং তার পরিবারের ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। পৈত্রিক ভিটায় কোনো নাগরিক যেন “পরবাসী” না হয়—এই প্রত্যাশাই সবার।

নিউজ ডেস্ক,অনলাইন